ব্যাংকার প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৬:২৪, ১৭ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১৬:২৪, ১৭ মার্চ ২০২৬
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে প্রায় চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল ঋণের সুদহার বাড়িয়ে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ। জনগণ যদিও এ নীতির সুফল পায়নি, বরং দুই অংকের নীতি সুদহারের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ আরো সংকুচিত হয়েছে। অন্যদিকে গত চার অর্থবছরে রেকর্ড ১ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকার বেশি নিট মুনাফা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অস্বাভাবিক এ মুনাফা অর্জনের ক্ষেত্রে সুদ আয়ের পাশাপাশি স্বল্প সময়ে টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়ন বড় ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত মাত্র চার অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক নিট মুনাফা করেছে ১ লাখ ৫২ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা। অর্জিত এ মুনাফা থেকে সরকারি কোষাগারে ৫১ হাজার ৫১২ কোটি টাকা জমা দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেকর্ড মুনাফার বড় অংশই এসেছে বৈদেশিক মুদ্রার পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে। এ চার বছরে ডলারের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আয় হয়েছে ৯৮ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা। এ আয়ের মধ্যে ৫৩ হাজার ১৫ কোটি টাকা রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। বাকি ৪৫ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা ডলারের পুনর্মূল্যায়নের ফলে এখনো অনর্জিত হিসাবে রয়েছে। আর ৫০ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা আয় এসেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে দেয়া ঋণের প্রাপ্ত সুদ থেকে। তারল্য সহায়তার অংশ রেপো ও স্পেশাল লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটিজ হিসেবে ব্যাংকগুলোকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া পুনঃঅর্থায়ন তহবিলগুলো থেকে প্রাপ্ত ঋণের সুদও এ খাতে যুক্ত হয়।
বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০-১১ বছরের সর্বনিম্ন জিডিপির ২২ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে এসেছে (২০২৩-২৪ অর্থবছরে এটি ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ ছিল)। যা দুর্বল ব্যবসায়িক পরিবেশের ইঙ্গিত দেয়।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংক ঋণ ৯ শতাংশ কমে চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। তীব্র ও চলমান সংকটের কারণে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত সংকুচিত হচ্ছে।
রেকর্ড পরিমাণ মুনাফার প্রভাবে এ চার বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ প্রায় ৫২ শতাংশ বেড়েছে। অথচ গত চার অর্থবছরজুড়েই দেশের অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির বিরূপ প্রভাবে এ সময়ে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে নাভিশ্বাস। বেসরকারি বিনিয়োগে নেমে এসেছে নজিরবিহীন স্থবিরতা। এ সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিবর্তে অনেক মানুষ বেকারত্বের শিকার হয়েছেন। সঞ্চয় ভেঙে ফেলায় মানুষের ভোগ ব্যয়েও পতন হয়েছে। ব্যয়ের তুলনায় আয় না বাড়ায় দারিদ্র্যের হার বেড়েছে বলেও দেশী-বিদেশী নানা সমীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ মুনাফা করা নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ব্যাংক খাতের তদারকি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিই তার মূল কাজ। অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের দুর্দশার কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা এতটা বেড়েছে। তবে মুনাফা করতে গিয়ে কোনোভাবেই যেন মূল লক্ষ্য থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিচ্যুত না হয়, সেটি নজরে রাখতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান অবশ্য বলেছেন, ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুনাফার উদ্দেশ্যে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেটি করেও না। কিন্তু কোনো কাজের ফলে যদি মুনাফা অর্জিত হয়ে যায়, তাহলে তো সেটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্বাহী পরিচালক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বছর মুনাফা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারি কোষাগারে ২২ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই এ মুনাফা অর্জিত হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারে যেসব দায়-দায়িত্ব আমাদের ওপর দেয়া হয়েছে, আমরা সেগুলোই পালনের চেষ্টা করছি।’
দেশের অর্থনীতি ও বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফাও নিয়ন্ত্রিত থাকে। যেমন ২০১৮ ও ২০১৯ সালের দিকে দেশের অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। এ কারণে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা ছিল ৫ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরেও এ মুনাফা ৬ হাজার ২৮৯ কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। ২০২০ সালের মার্চ থেকে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বে কভিড-১৯ মহামারী ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেশের অর্থনীতিতে নেমে আসে নজিরবিহীন স্থবিরতা। তবে অর্থনীতি বাঁচাতে সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। বিভিন্ন খাতের জন্য গঠন করা হয় স্বল্প সুদের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল। প্রণোদনা ও নীতিসহায়তার কারণে সে সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে সাময়িক রক্ষা পায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা হয় ৫ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা।
অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতে বড় বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয় ২০২২ সালের শুরুতে। দেড় দশকজুড়ে ব্যাংক খাতে সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের প্রভাবে ভেঙে পড়তে শুরু করে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কভিড-১৯ থেকে পুনরুদ্ধার ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব। দেশের বাজারে তৈরি হতে শুরু করে নজিরবিহীন ডলার সংকট। আর সংকট মেটানোর কথা বলে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২১-২২ অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে বিক্রি করা হয় ৭৬২ কোটি বা ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ বিক্রি আরো বাড়িয়ে ১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে বিক্রি করা হয় আরো ১২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। টানা তিন অর্থবছর ধরে ডলার বিক্রির কারণে রিজার্ভে বড় ধরনের পতন হয়। ২০২১ সালের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার। সে রিজার্ভ কমে ২০২৪ সালের মাঝামাঝিতে ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে যায়। আর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) রিজার্ভ নেমে যায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। এ তিন বছরে প্রতি ডলার ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, স্বল্প সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়নের প্রভাবে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফায় উল্লম্ফন ঘটেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ মুনাফা বেড়ে ২৯ হাজার ৩২৭ কোটি টাকায় ঠেকে। এর মধ্যে ২৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকার আয় আসে বিনিময় হার পুনর্মূল্যায়নজনিত খাত থেকে। ডলার বিক্রির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্জিত আয় হয় ২ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা।
বেশি দামে ডলার বিক্রির ফলে এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা বাড়ার পাশাপাশি বাজার থেকে তারল্যও উঠে আসে। ফলে দেশের ব্যাংক খাতে সৃষ্টি হয় তারল্য সংকট। আর এ সংকট মেটাতে ব্যাংকগুলোকে রেপো ও এএলএসের মাধ্যমে অর্থ ধার বাড়াতে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে সুদ খাত থেকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয় বাড়তে শুরু করে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মুনাফার পরিমাণ ৪৭ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকায় ঠেকে। এর মধ্যে ৯ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা আয় আসে সুদ খাত থেকে। আর ডলার বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত আয় দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৫২ কোটি টাকা। একই সময়ে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে ১৯ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকার অনর্জিত আয়ও হয়।
অর্থনৈতিক নানা সংকট ও বিনিময় হার বৃদ্ধির প্রভাবে ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকেই মূল্যস্ফীতি উসকে উঠতে শুরু করে। আর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসে নীতিসুদহার বাড়াতে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে সুদ খাত থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয়ও বেড়ে যায়। ওই অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা দাঁড়ায় ৪০ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকায়। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা এসেছে সুদ আয় থেকে। আর ডলার বিক্রি থেকে অর্জিত আয় দাঁড়ায় ২২ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারও পালিয়ে যান। ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি দায়িত্ব নিয়েই মূল্যস্ফীতি কমানোর কথা বলে নীতিসুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করেন। এর প্রভাবে সুদ খাত থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয় আরো বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয় রেকর্ড ২২ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা। আর ডলার বিক্রি থেকেও ১০ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা আয় অর্জিত হয়। এতে গত অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা হয় ৩৪ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা।
কাঠামোগত কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা এত বেশি বেড়েছে বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিসুদহার বাড়িয়েছে। বর্ধিত এ সুদহারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। আমরা কোনো গ্রাহককে ঋণ দিলে সেটি খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণে খেলাপির কোনো ঝুঁকি নেই।’
তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিময় হার এতটা উসকে ওঠার পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যর্থতা রয়েছে বলে মনে করেন এ জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার। তিনি বলেন, ‘সঠিক সময়ে নীতিসুদহার বাড়ানো হলে মূল্যস্ফীতির ক্ষতি এতটা নাও বাড়তে পারত। আবার বিনিময় হারও ধরে না রেখে ধীরে ধীরে বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে ডলারের দাম এতটা বাড়তে না। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও চাপাচাপির কারণে ক্ষতিটা এত বেশি বেড়েছে।’
অর্জিত এ মুনাফা থেকে গত অর্থবছরে রেকর্ড ২২ হাজার ৬২০ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১০ হাজার ৬৫৩ কোটি ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে মাত্র চার অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার মুনাফা থেকে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে ৫১ হাজার ৫১২ কোটি টাকা।
এদিকে উচ্চ সুদের কারণে দেশের বেসরকারি খাত অনেক দিন ধরে খারাপ পরিস্থিতিতে রয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের অবস্থা খুবই নাজুক। এত উচ্চ সুদ দিয়ে মুনাফা করা সম্ভব নয়। উদ্যোক্তাদের বড় অংশ কেবল অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। এফবিসিসিআই, বিসিআইসহ সব ব্যবসায়ী সংগঠন বহু আগে থেকেই সুদহার কমিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছে। আশা করছি, নতুন সরকারের মেকানিজম এমন হবে যাতে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যায়।’
বিপুল মুনাফার প্রভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে সম্পদ ও দায়ের পরিমাণও দ্রুত বড় হচ্ছে। ২০২১ সালের জুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭ কোটি টাকা। কিন্তু মাত্র চার বছর পর ২০২৫ সালের জুনে এসে এটির পরিমাণ ৭ লাখ ১০ হাজার ৪৬২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। সে হিসাবে চার বছরের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ বেড়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ সময়ে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
মুনাফা করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাতে নিজেদের মূল দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত না হয়, সেটি খেয়াল রাখা দরকার বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবেও রয়েছেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বে থাকা ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল দায়িত্ব হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। প্রায় চার বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ভুগছে। অর্থনীতিতে বিনিয়োগ শূন্যতাও চলছে। এ পরিস্থিতিতে কীভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখেও বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সেটি খুঁজে বের করতে হবে। আইনে অনুমোদিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা হতে পারে। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে যেন কোনো কর্মসূচি পরিচালিত না হয়।’
বাংলাদেশ ব্যাংক তার মুনাফা থেকে মাত্র চার বছরে ৫১ হাজার কোটি টাকার বেশি সরকারি কোষাগারে জমা দিলেও এক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। অথচ সরকারের মালিকানাধীন সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক সৃষ্টি হয়েছিল মুনাফার উদ্দেশ্যে। যদিও সরকারি কোষাগারে মুনাফার অংশ দেয়া তো দূরের কথা, এ ব্যাংকগুলোর মধ্যে কেবল সোনালী ছাড়া বাকিগুলো অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম করছে।
নীতিসুবিধার আওতায় পুনঃতফসিল করার পরও গত বছরের ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা, যা এ ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ। একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন বা সঞ্চিতি ঘাটতিতেও ছিল। এ ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির পরিমাণ এখন সঞ্চিতি ঘাটতির চেয়েও বেশি। আর পুরো ব্যাংক খাতের পরিমাণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লাইসেন্স পাওয়া অর্ধেকের বেশি ব্যাংক এখন রুগ্ণ। এর মধ্যে এক ডজনের বেশি ব্যাংক গ্রাহকদের আমানতের অর্থও ফেরত দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এদিকে রেকর্ড মুনাফা থেকে বোনাস পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের চাহিদা ও দাবি ক্রমাগত বাড়ছে। গত অর্থবছর নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির সব কর্মকর্তা-কর্মচারী সর্বনিম্ন ছয়টি বোনাস (মূল বেতনের ছয় গুণ) পেয়েছেন। এ বোনাস আদায় করার জন্য গভর্নরসহ পরিচালনা পর্ষদের ওপর চাপ সৃষ্টিরও অভিযোগ রয়েছে। গত বছর কেবল বোনাস দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। এ বছরও একই হারে বোনাস আদায়ের জন্য চাপ দেয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে।
মুনাফার স্বার্থে কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে না বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অনেকগুলো উপকরণের মধ্যে একটি হলো নীতিসুদহার বাড়ানো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিন বছর ধরে নীতিসুদ বাড়িয়েছে। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে এ সুদহার ১০ শতাংশ। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা বাড়ছে। বাংলাদেশের মতো দেশে কেবল নীতিসুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা বোকামি। কারণ এখানে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী থাকার বড় কারণ সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি। অন্তর্বর্তী সরকার বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেনি। চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সিন্ডিকেট ভাঙা কিংবা চাঁদাবাজি বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে বলে শুনিনি।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক পদে থাকা এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘মুনাফা বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আনন্দিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ এ মুনাফা বৃদ্ধিতে তাদের কোনো ভূমিকাও নেই। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকে যেসব ঘটনা ঘটেছে, “মব” হয়েছে, সেগুলো কোনোভাবেই কাম্য নয়। অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলার স্বার্থে আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সুশাসন দরকার।’
সূত্র: বণিক বার্তা
এএ
ব্যাংকার প্রতিবেদন