ঢাকা, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

২৩ কার্তিক ১৪৩৩, ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

ব্যাংক বাঁচালেই হবে না, বাঁচাতে হবে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা

ব্যাংকার প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৭:০৬, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৭:১১, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্যাংক বাঁচালেই হবে না, বাঁচাতে হবে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা

একজন চাকরিজীবী কর্মজীবনের দীর্ঘ সঞ্চয়—প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ও অন্যান্য পাওনার প্রায় পুরোটাই ব্যাংকে রাখেন। অবসরের পর সেই সঞ্চয় থেকে পাওয়া সুদ বা মুনাফায় সংসার চালানোর পরিকল্পনাও থাকে অনেকের। তাই ব্যাংক তাঁদের কাছে শুধু অর্থ রাখার জায়গা নয়, বরং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অন্যতম ভরসা।

কিন্তু সেই ভরসাই এখন প্রশ্নের মুখে। ব্যাংকের আর্থিক দুরবস্থার কারণে অনেক আমানতকারী সময়মতো টাকা তুলতে পারছেন না। কেউ প্রত্যাশিত মুনাফা পাচ্ছেন না, আবার কেউ নিজের জমা অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়েও উদ্বিগ্ন।

এই অনিশ্চয়তা শুধু চাকরিজীবীদের নয়। কৃষক, অটোচালকসহ স্বল্প আয়ের বহু মানুষও ব্যাংকে সঞ্চয় রেখে এখন দুশ্চিন্তায় আছেন। ব্যাংকের মতো একটি নিরাপদ আর্থিক আশ্রয় যখন অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তখন সংকট শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ধীরে ধীরে তা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।

একটি ব্যাংক আর পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা এক বিষয় নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতির গভীরতা বোঝাতে কয়েকটি তথ্যই যথেষ্ট।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় খেলাপি ঋণের হার ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের হার আঞ্চলিক গড়ের চার গুণেরও বেশি।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধন-ঝুঁকি অনুপাত ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশ। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের মোট আর্থিক খাতের সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশই ব্যাংকিং খাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর প্রভাব পড়ে আমানতকারী, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, চাকরিজীবী এবং শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতির ওপর।

ব্যাংকের মূল কাজ হলো মানুষের সঞ্চয় সংগ্রহ করে তা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা। এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হলে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ কমে যায়। নতুন শিল্পে বিনিয়োগ কমে, বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ সংকুচিত হয়, কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিনিয়োগের ব্যয় বেড়ে যায়। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতের সংকট শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এ অবস্থায় কোনো একটি ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়লে তাকে তারল্য সহায়তা দেওয়া, মূলধন জোগানো, ঋণ পুনঃতপশিল করা কিংবা সরকারি সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে সাময়িকভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। কিন্তু সংকট যদি পুরো ব্যবস্থাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে শুধু একের পর এক ব্যাংককে বাঁচানোর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।

বিশেষ করে অনিয়মকারী মালিক, পরিচালক বা ঋণগ্রহীতাদের জবাবদিহির আওতায় না এনে শুধু অর্থ ঢেলে কোনো ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। এতে সমস্যার মূল কারণ দূর হওয়ার বদলে সংকট কেবল কিছুটা পিছিয়ে যায়।

আজ একটি ব্যাংককে বাঁচাতে অর্থ দেওয়া হলো, কাল একই কারণে আরেকটি ব্যাংক সংকটে পড়ল—এভাবে চলতে থাকলে একসময় প্রশ্ন উঠবেই, এর শেষ কোথায়?

তাই এখন প্রয়োজন শুধু ব্যাংক রক্ষা নয়; আমানতকারীর আস্থা, ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং আর্থিক খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সংকট মোকাবিলায় সাময়িক সহায়তার পাশাপাশি অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

ব্যাংকার প্রতিবেদন

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন