বাণিজ্য ডেস্ক
প্রকাশ: ১০:৪৯, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১১:২০, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আন্তলেনদেনযোগ্য (ইন্টারঅপারেবল) ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কিউআরভিত্তিক লেনদেনের অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি, তথ্যের নিরাপত্তা এবং শক্তিশালী নীতিগত কাঠামো নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ২.০: নীতিগত লক্ষ্য, লেনদেনের বাস্তুতন্ত্র এবং টেকসই রূপরেখা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পাশাপাশি শক্তিশালী ইন্টারনেট অবকাঠামোও এখন অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। শক্তিশালী ইন্টারনেট ব্যবস্থা ছাড়া ডিজিটাল ফিন্যান্স ও ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নেই।
তিনি বলেন, ডিজিটালাইজেশন ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পথে সাময়িক কিছু বাধা আসতে পারে। তবে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং নীতিগত সহায়তা কার্যকর থাকবে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে উদ্যোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব মানুষের অভাব নেই। বিশেষ করে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতের উদ্যোক্তারা নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত। তবে অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, জটিল প্রক্রিয়া এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতা তাঁদের অগ্রযাত্রায় বাধা তৈরি করছে।
বিকাশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল কাদীর বলেন, বাংলা কিউআর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। তবে এর অপব্যবহার ঠেকাতে যথাযথ পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলা কিউআর ব্যবহারে যে নিয়মকানুন করেছে, সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন ও তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
নগদের চেয়ারম্যান কায়জার আহমেদ চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি বাংলা কিউআর লেনদেনে আন্তলেনদেন ফি (আইআরএফ) শূন্য করা হয়েছে। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত বাংলা কিউআর উদ্যোগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে কিউআর কোডের ব্যবহার ও লেনদেন হঠাৎ তিন গুণ বেড়ে যাওয়ার তথ্যও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, কিউআরভিত্তিক লেনদেনে মানুষকে উৎসাহিত করতে সরকার আগামী পাঁচ বছর বছরে ২ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দিতে পারে।
তিনি বলেন, শুরুতে গ্রাহক ও বিক্রেতা—কেউই বাড়তি ফি দিতে আগ্রহী নাও হতে পারেন। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে ভর্তুকি দিয়ে এই ব্যবস্থা জনপ্রিয় করা যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে ভর্তুকি সমন্বয় করা সম্ভব।
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মাহতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, স্মার্টফোনের ব্যবহার প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় বাংলা কিউআরের মতো ডিজিটাল সেবা সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। সাধারণ মোবাইল ফোনে এ সেবা ব্যবহার কঠিন হওয়ায় দেশের প্রায় ৩৫ শতাংশ গ্রাহক এর বাইরে থাকছেন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলা কিউআরে লেনদেন বাড়াতে শুধু ফি মওকুফ বা নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম চাপিয়ে দিলেই হবে না। সব পক্ষের স্বার্থ নিশ্চিত না হলে মানুষ আবার নগদ লেনদেনের দিকেই ফিরে যেতে পারে।
ভিসার কান্ট্রি ম্যানেজার সাব্বির আহমেদ বলেন, সিএমএসএমই খাতে ঋণ দেওয়ার প্রচলিত ব্যবস্থা এখন সময়োপযোগী নয়। জামানতনির্ভর ঋণব্যবস্থার কারণে অনেক উদ্যোক্তার জন্য অর্থায়ন ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে আছে। এই খাতকে এগিয়ে নিতে সমন্বিত ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামদুদুর রশীদ বলেন, ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে জালিয়াতির ঝুঁকিও বাড়ছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকার বা বেসরকারি খাতের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের আহ্বান জানান।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবদুস সাত্তার মণ্ডল, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন, ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের।
বাণিজ্য ডেস্ক