ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১৩ আশ্বিন ১৪৩৩, ১৫ রবিউস সানি ১৪৪৮

ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের সুদেও ১০% কর, আপত্তি ক্ষুদ্রঋণ খাতের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১০:৪৫, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১০:৪৬, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের সুদেও ১০% কর, আপত্তি ক্ষুদ্রঋণ খাতের

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

প্রতিদিন ১০–২০ টাকা করে সঞ্চয় করেন ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের লাখো সদস্য। তাঁদের এই সঞ্চয়ের বিপরীতে পাওয়া সুদের ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটতে চায় সরকার। এ নিয়ে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ ও ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সদস্যদের সঞ্চয়ের ওপর দেওয়া সুদের উৎসে কর এখন একসঙ্গে জমা দিতে হবে। দেরির জন্য ২ শতাংশ জরিমানাও দিতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) সূত্র অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৬৩৩টি। এসব প্রতিষ্ঠানের সদস্যসংখ্যা ৪ কোটি ৭৩ লাখ। তাঁদের সঞ্চয়ের স্থিতি প্রায় ৯৫ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। ঋণগ্রহীতা সদস্য রয়েছেন ৩ কোটি ৬১ লাখ।

যে আইনের ভিত্তিতে কর দাবি

এনবিআর ২০২৩ সালের আয়কর আইনের ১০২(১) ধারার ভিত্তিতে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর দেওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছে। ওই ধারায় ব্যাংক, বিমা, লিজিং, ফাইন্যান্স কোম্পানি, সমবায় বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সুদ বা মুনাফা দিলে তা পরিশোধের সময় উৎসে কর কাটার বিধান রয়েছে।

কোম্পানি, ট্রাস্ট ও ব্যক্তিসংঘকে সুদ বা মুনাফা দেওয়ার ক্ষেত্রে করের হার ২০ শতাংশ। অন্যদের ক্ষেত্রে হার ১০ শতাংশ।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয়কারী সদস্যদের সুদও এই ‘অন্যদের’ আওতায় পড়ে। ফলে কোনো সদস্য ১০০ টাকা সুদ পেলে ১০ টাকা উৎসে কর কেটে ৯০ টাকা দেওয়ার কথা।

এনবিআরের চিঠিতে বলা হয়েছে, আইনে উৎসে কর কাটার বিধান থাকলেও এত দিন ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো তা করেনি। ফলে সরকারি কোষাগারেও এই অর্থ জমা হয়নি।

আপত্তি ক্ষুদ্রঋণ খাতের

ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যদের সঞ্চয়ের সুদ করমুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছে ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)। ২২ সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রী, এনবিআর চেয়ারম্যান, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান এবং এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যানের কাছে এ বিষয়ে আবেদন করেছে সংগঠনটি।

সিডিএফ ১২৯টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের একটি নেটওয়ার্কিং সংগঠন।

সিডিএফের চেয়ারম্যান ও পিপলস ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রাম ইমপ্লিমেন্টেশনের (পপি) নির্বাহী সচিব মুর্শেদ আলম সরকার বলেন, সদস্যরা অল্প অল্প করে সঞ্চয় করেন। তাঁদের কাছ থেকে উৎসে কর কেটে নেওয়ার উদ্যোগ সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

তাঁর মতে, এতে দরিদ্র মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

‘এই সঞ্চয় অনেক পরিবারের নিরাপত্তা’

সিডিএফের আবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র সঞ্চয় অনেক পরিবারের জন্য বিপদের সময় আর্থিক নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করে। পরিবারের সদস্যের অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলহানি কিংবা আকস্মিক আয় কমে গেলে এই অর্থ কাজে আসে। অনেক ক্ষেত্রে এটি অনানুষ্ঠানিক বিমার মতোও ভূমিকা রাখে।

সংগঠনটির দাবি, এমআরএ আইন, ২০০৬ অনুযায়ী ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সদস্যদের কাছ থেকে সঞ্চয় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার এমআরএ বিধিমালা, ২০১০ অনুযায়ী এসব সঞ্চয়ের ওপর নির্ধারিত সুদ পাওয়াও সদস্যদের অধিকার।

সিডিএফ মনে করে, ক্ষুদ্রঋণ খাতে সদস্যদের সঞ্চয়ের সুদের ওপর উৎসে কর আরোপের বিষয়টি আইনে স্পষ্ট নয়। এ কর আরোপ করা হলে দরিদ্র মানুষ সঞ্চয়ে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

করের পরিমাণ হতে পারে প্রায় ৪৮০ কোটি টাকা

সিডিএফের হিসাবে, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণ খাতে মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল ৭৯ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। গড়ে ৬ শতাংশ সুদ হিসাব করলে বছরে সুদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা।

এই সুদের ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হলে করের পরিমাণ প্রায় ৪৭৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা হতে পারে।

অন্যদিকে, একটি কর অঞ্চলের কমিশনারের মতে, আয়কর আইনে আমানতের মুনাফার ওপর উৎসে কর কাটার বিধান রয়েছে এবং ব্যক্তি পর্যায়ে করের হার ১০ শতাংশ। তাই কর কর্মকর্তারা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

তবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক সঞ্চয়কারীদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এমআরএ যদি এনবিআরের কাছে ছাড়ের সুপারিশ করে, তাহলে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলেও তিনি জানান।

এমআরএও বলছে, কর প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়

এ বিষয়ে এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয় করা ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের সুদের ওপর উৎসে কর প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়।

বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

নিজস্ব প্রতিবেদক

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন