ঢাকা, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

২১ মাঘ ১৪৩২, ১৬ শা'বান ১৪৪৭

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড নাকি চাপ?

বাংলাদেশের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের মুহূর্ত

এমএম শহিদুল হাসান

প্রকাশ: ১৬:১৩, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৬:১৩, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড নাকি চাপ?

দ্রুত এবং প্রায়ই অনিশ্চিত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এ সময়ে ভবিষ্যৎ ক্রমেই তাদের পক্ষেই যাবে, যারা শক্তিশালী বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার সঙ্গে ডিজিটাল সক্ষমতাকে সমন্বিত করতে পারবে। অনেক রুটিন কাজে যন্ত্র মানুষের শ্রমকে প্রতিস্থাপন করছে, তবু বাংলাদেশের জন্য জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) কাজে লাগানোর সুযোগ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে সুযোগ সংকুচিত হবে। এ প্রেক্ষাপট তাৎক্ষণিক, সমন্বিত ও দৃঢ় নীতিগত পদক্ষেপের দাবি জানায়। অর্থনৈতিক কৌশলে উন্নয়নের কেন্দ্রে মানুষকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রবৃদ্ধি হতে হবে কর্মসংস্থানমুখী। তবে একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতানির্ভর, যাতে দেশের বিপুল জনসংখ্যা বেকারত্ব ও সামাজিক চাপের উৎস না হয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার শক্তিতে রূপ নেয়।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৭-৩৮ শতাংশের বয়স ২০ বছরের নিচে, যা দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশে পরিণত করেছে। প্রতি বছর আনুমানিক ২০-২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, অথচ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে মাত্র ১২-১৪ লাখ। এ স্থায়ী ব্যবধানই ব্যাখ্যা করে কেন বেকারত্ব বাংলাদেশে একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। যদিও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ, এ সংখ্যা বাস্তব পরিস্থিতিকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না। বিশেষ করে ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায়ই ৯ শতাংশের বেশি থাকে, যা শিক্ষা, দক্ষতা, শ্রমবাজারের চাহিদা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতির মধ্যে গভীর অসামঞ্জস্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

এ বাস্তবতা এমন একটি উন্নয়ন কৌশলের দাবি জানায়, যার কেন্দ্রে থাকবে উৎপাদনশীল বহুমুখীকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক সংযোগ। যার সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে ডিজিটাল রূপান্তর ও পরিকল্পিত দক্ষতা উন্নয়ন। লক্ষ্য কেবল শ্রমশক্তির আকার বাড়ানো নয়; বরং অভিযোজ্য দক্ষতা, উপযুক্ত প্রযুক্তি এবং উচ্চমানের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে প্রতি কর্মীর উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। সে কারণে শিল্প ও উদ্যোক্তা নীতিকে সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, একই সঙ্গে সামাজিক বাস্তবতা, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট এবং মানব আচরণের ধরন সম্পর্কে সংবেদনশীল থাকতে হবে। শেষ পর্যন্ত সাফল্য নির্ভর করবে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবায়নযোগ্যতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ওপর—প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, নীতির সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সঙ্গে অর্থবহ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে।

বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক চাপকে কেবল সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখলে চলবে না; এগুলো একই সঙ্গে উদ্ভাবন ও নতুন উদ্যোগ সৃষ্টির সুযোগও তৈরি করে। জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ তখনই বাস্তবায়ন হবে, যখন তরুণরা কেবল সনদধারী না থেকে মূল্য সৃষ্টিকারীতে পরিণত হবে—যারা প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা উদ্যোগ এবং মানব সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মের উদ্যোগ গড়ে তুলতে সক্ষম। যেখানে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশকারীদের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না, সেখানে বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের মধ্যে উদ্যোক্তা উন্নয়নকে প্রান্তিক বিকল্প নয়, বরং অর্থনৈতিক কৌশলের একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের শিল্প ভিত্তি প্রধানত স্বল্পমূল্যের, শ্রমঘন উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে অদক্ষ ও অর্ধদক্ষ শ্রমিকের আধিপত্য রয়েছে। বিপরীতে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কমসংখ্যক, তবে উচ্চশিক্ষিত ও অভিযোজ্য—আন্তঃবিষয়ক এবং ধারাবাহিকভাবে দক্ষতা উন্নয়নে সক্ষম—মানবসম্পদ। এই রূপান্তর একদিনে সম্ভব নয়; তাই ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া অপরিহার্য। স্বল্পমেয়াদে (১-৩ বছর) অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যবসা পরিচালনার সহজীকরণ সংস্কার ত্বরান্বিত করা এবং স্টার্টআপ অর্থায়ন ও ব্যবসা সহায়তা সেবার বিস্তার। মধ্যমেয়াদে (৩-৭ বছর) গুরুত্ব দিতে হবে আর্থিক খাত সংস্কারের গভীরতা বাড়ানো, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ, উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেম শক্তিশালী করা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডর উন্নয়নে। দীর্ঘমেয়াদে (৭-১৫ বছর) প্রয়োজন হবে উন্নত শিল্প, উদ্ভাবন ব্যবস্থা, আজীবন শিক্ষার অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় টেকসই বিনিয়োগ।

এই ধাপভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে নীতিগতভাবে তিনটি অগ্রাধিকার বিশেষভাবে গুরুত্ব পেতে হবে। প্রথমত, শিল্পের বহুমুখীকরণ ও মূল্য সংযোজন—রেডিমেড গার্মেন্টসের অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে ওষুধ শিল্প, চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আইটি-সক্ষম সেবার মতো খাত বিকাশের মাধ্যমে, যেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা প্রণোদক ভূমিকা রাখতে পারেন। দ্বিতীয়ত, কৃষির আধুনিকায়ন ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা—জলবায়ু সহনশীল ফসল, প্রিসিশন কৃষি, ফসল-পরবর্তী ক্ষতি কমাতে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ (যা বর্তমানে আনুমানিক ২৫-৩০ শতাংশ) এবং কৃষককে নগর ও রফতানি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল অর্থনীতির অগ্রগতি—দেশব্যাপী ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো, ফিনটেক, ই-কমার্স ও সফটওয়্যার রফতানিতে সহায়তা এবং লেনদেন ব্যয় ও দুর্নীতি কমাতে ডিজিটাল শাসন ব্যবস্থা জোরদারের মাধ্যমে।

এই সব উচ্চাকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে রয়েছে শিক্ষা সংস্কার। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা—বাংলাদেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন ধাপে ধাপে, লক্ষ্যভিত্তিক সংস্কার, যাতে তরুণরা পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত শ্রমবাজারের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারে। প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীল সম্পৃক্ততা এবং উদ্যোক্তামুখী মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে। উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ দক্ষতাসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরি—যারা নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীরতা অর্জনের পাশাপাশি স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতার কার্যকর প্রস্থও গড়ে তুলবে—যাতে তারা কেবল চাকরির জন্য নয়, স্বনিয়োজিত হওয়া, উদ্ভাবন এবং ধারাবাহিক দক্ষতা উন্নয়নের জন্যও প্রস্তুত থাকে।

সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো এ উপলব্ধি যে, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে শেখার সমাপ্তি আর সম্ভব নয়। প্রযুক্তি ও শিল্পের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আজীবন শিক্ষা একটি সামাজিক মানদণ্ডে পরিণত হতে হবে—যার সহায়তায় থাকবে নমনীয় সনদ ব্যবস্থা, মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল, শিল্প-সংযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং কর্মজীবনজুড়ে সহজলভ্য পুনর্দক্ষতা অর্জনের পথ। এ ধরনের ব্যবস্থা ছাড়া দক্ষতা এমন গতিতে অবমূল্যায়িত হবে, যার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো তাল মেলাতে পারবে না।

বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে জনসংখ্যা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক রূপান্তর এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, শিল্পনীতি এবং দক্ষতা গঠনে আজ যে সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে, সেগুলোই নির্ধারণ করবে—দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিনে পরিণত হবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপের উৎস হবে। জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ অর্জন কোনো স্লোগান বা স্বল্পমেয়াদি সমাধানের বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্যশীল সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সামঞ্জস্য এবং মানুষের ওপর ধারাবাহিক বিনিয়োগ। শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা সামঞ্জস্য করে, উদ্যোক্তা উন্নয়নকে লালন করে, আজীবন শিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে এবং মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে বাংলাদেশ এমন একটি উন্নয়ন পথ তৈরি করতে পারে, যা একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক ও সামাজিকভাবে সহনশীল। চ্যালেঞ্জ নিঃসন্দেহে বড়, তবে সময়োপযোগী, সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিলে সুযোগ এখনো হাতের নাগালেই রয়েছে।

লেখক: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও প্রাক্তন উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ।

এএ

এমএম শহিদুল হাসান

আরও পড়ুন