ওবায়দুল্লাহ রনি, সানাউল্লাহ সাকিব
প্রকাশ: ১৩:১০, ৭ জুন ২০২৬ | আপডেট: ২৩:০১, ৭ জুন ২০২৬
দেশের আর্থিক খাত বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত নিয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে। এরপরও দেশের অর্থনীতি বড় হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী ৭৮৬ কোটি টাকার প্রথম বাজেট থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিতে যাচ্ছে সরকার। দেশের অর্থনীতি আজকের যে অবস্থানে এসেছে, অর্থায়নের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রেখেছে ব্যাংক খাত। এখানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অধিকাংশ অর্থায়ন আসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে। কারণ দেশের পুঁজিবাজার চাহিদামতো পুঁজি জোগান দিতে পারেনি। আর বন্ড বাজারকেও আস্থার জায়গায় নেওয়া যায়নি।
ফলে ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের সাথে পুরো অর্থনীতির ভালো-মন্দের বিষয়টি সম্পৃক্ত। একটি কার্যকর ও শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং নিয়মকানুনের কঠোর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।
নানা কারণে দেশের ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা অনেক কমেছে। এখন কোনোভাবেই যেন আরও তলানিতে না নামে, সেই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে লক্ষ রাখা জরুরি। সুশাসন নিশ্চিত করতে ও দুর্নীতি প্রতিরোধে গণমাধ্যম 'চতুর্থ স্তম্ভ' হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। যদিও যারা সরকারে থাকেন, অনেক দেশে তারা গণমাধ্যমের ভূমিকাকে কখনো কখনো খারাপ দৃষ্টিতে দেখেন। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা না করে তোষামোদি করুক—এমন প্রত্যাশা করেন। আর এ কারণে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের নানা চেষ্টা আমরা ইতিপূর্বেও দেখেছি।
সবার জানা আছে, দেশের কয়েকটি ব্যাংকের পাশাপাশি অনেক ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে মানুষ এখন টাকা ফেরত পাচ্ছে না। ফলে মানুষ জমানো টাকা নিয়ে আতঙ্কিত অবস্থায় আছে। টাকা সময়মতো না পেয়ে অনেকে চিকিৎসা করতে পারছেন না, অনেকে ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন।
দেশের ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান মানুষের জমানো টাকা সময়মতো ফেরত দিতে পারছে না। ২০১৯ সাল থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এই দুরবস্থা প্রথম সামনে আসে। ২০২১ সাল থেকে কয়েকটি ব্যাংকও মানুষের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। বর্তমানে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ইসলামী ব্যাংকসহ অন্তত ১৪টি ব্যাংক চাহিদামতো আমানত ফেরত দিতে পারছে না। কোনোভাবেই এ সংখ্যা আরও বাড়লে অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনবে। আমানতকারীর আস্থা ধরে রাখার জন্য সুশাসন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
আমরা দেখে থাকি, প্রতিটি সরকার তার জনপ্রিয়তার জন্য সুদহার কমানোর স্বল্পমেয়াদি নানা চেষ্টা করে থাকে। তবে এটা টেকসই কোনো ব্যবস্থা না। আবার বাস্তবে দেখা যায়, এ রকম জোরপূর্বক উদ্যোগে কোনো কাজ হয় না। বরং সুদহার কমানোর টেকসই ব্যবস্থা হতে পারে সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানো। বাংলাদেশের উচ্চ সুদহারের অন্যতম কারণ উচ্চ খেলাপি ঋণ ও ব্যাংকগুলোর উচ্চ তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়।
গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে। তবে আর্থিক খাতের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম যথাযথ ভূমিকা পালনের চেষ্টা করেছে বলে আমরা মনে করি। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল সময়ে বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারিতে অন্তত সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। প্রতিটি অনিয়মের চিত্র গণমাধ্যমে ওই সময় ভালোভাবে উঠে এসেছে। এমনকি বিশ্বের প্রথম সারিতে যাওয়া ২০১৬ সালের রিজার্ভ চুরির চিত্র মানুষ গণমাধ্যম সূত্রে প্রথম জানতে পারে। ২০১৭ সালে প্রথমে ইসলামী ব্যাংক, পরে এসআইবিএল দখল এবং ২০১৮ সালে হোটেলে বসে ব্যাংকগুলোর বিধিবদ্ধ জমা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা (সিআরআর) কমানো, ব্যাংক মালিকদের চাপে সুদহারের নয়-ছয়ের চিত্র, বারবার পুনর্তফসিলসহ নানা সুবিধার আড়ালে খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশসহ সবই গণমাধ্যম ভালোভাবে তুলে এনেছে। আবার এস আলম, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা, হল-মার্ক, বিসমিল্লাহ, জেসিন্ট ফোর, অ্যাননটেক্স, পদ্মা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংকসহ সব বড় ঋণ কেলেঙ্কারির তথ্য ওই সময়েই বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। অন্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সময়মতো প্রকাশ না হলেও আর্থিক খাতের গণমাধ্যমকর্মীরা সব সময় সরব ছিলেন। সব অনিয়মই সময়মতো প্রকাশ হয়েছে।
একটি বিষয়ে আলোকপাত করলে আর্থিক খাতে গণমাধ্যমের ভূমিকা আপনাদের কাছে আরও পরিষ্কার হবে বলে মনে করি: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি ব্যাংকিং খাত বিষয়ে যত ধরনের অনিয়মের তথ্য তুলে এনেছেন, তার সবই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য প্রকাশিত হলেও সে সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকার কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা সেটি ভিন্ন আলোচনার বিষয়।
নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে—সাংবাদিকদের কলম থামাতে ব্যর্থ হয়ে ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এমন এক সময়ে ওই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল যখন শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকের চলতি হিসাব ঋণাত্মক রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ জালিয়াতির মাধ্যমে তহবিল সাপোর্ট দিচ্ছিল। নানাভাবে চেষ্টা করেও চব্বিশের আগস্টের আগে পর্যন্ত সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়নি। ওই সময়ে সবাই চুপ থাকলেও অর্থনৈতিক সাংবাদিকরা দাবি আদায়ে কঠোর ছিলেন। গণমাধ্যমে আর্থিক খাতের অনিয়ম প্রকাশ হচ্ছিলই।
আপনাদের মনে থাকার কথা, ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই গভর্নর কোনো বক্তব্য দিলে বয়কটের ঘোষণা দেন ইআরএএফ (ERAF)-এর তৎকালীন সভাপতি। এমন সাহসী ঘোষণার সাথে উপস্থিত সব সাংবাদিক একাত্মতা জানান। ওই সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকিং খাত ইস্যুতে অনেক প্রশ্ন আসলেও তখনকার গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। পুরো সময় তিনি গালে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। এই সাহসী উচ্চারণের জন্য ইআরএএফ-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
আমরা দেখেছি, তখনকার গভর্নর রউফ তালুকদার সরকার পতনের পর থেকে পালিয়ে থাকার চিত্র। বিশ্বের ইতিহাসে কোনো গভর্নর এভাবে পালিয়ে পদত্যাগের চিত্র সম্ভবত এটিই প্রথম। দুঃখের সাথে লক্ষ করা যাচ্ছে, ৫ আগস্টের পরও ব্যাংক খাতের সংবাদ সংগ্রহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকের তৃতীয় তলায় সাংবাদিকদের প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছে। দ্রুততম সময়ে এই সমস্যার সমাধান করা হবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।
ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছিলেন ব্যবসায়ীরা
ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিতের বিষয়টি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয়। ফলে সুশাসন নিশ্চিত করার সঙ্গে গণতন্ত্রের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আবার গণতন্ত্র শক্তিশালী হওয়ার পূর্বশর্ত অবশ্যই স্বাধীন গণমাধ্যম। বলা হয়ে থাকে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশে শক্তিশালী গণতন্ত্র ছিল। এই সময়েই ব্যাংক খাতের সুশাসন নিয়ে তেমন প্রশ্ন ওঠেনি। কেবল রাজনৈতিক কারণে কেউ অনিয়ম-দুর্নীতি করে পার পায়নি। আবার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে পরবর্তী সময়ে। বিশেষ করে একতরফা নির্বাচনী ব্যবস্থা শুরুর পর ব্যাংক খাতে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। ধীরে ধীরে সরকার এত দুর্বল অবস্থায় চলে গিয়েছিল যে, মানুষের স্বার্থ না দেখে কেবল গোষ্ঠীস্বার্থ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪—এই তিনটি নির্বাচনের আগে একটি কমন বিষয়ে মিল ছিল। প্রতিবার ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে পরিবারতন্ত্র আরও পোক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনের আগেই ঋণ পুনর্তফসিলের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। একপর্যায়ে দেশে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যেন, ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছিলেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যাংক দখলে সহায়তা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউ (BFIU)-এর সহায়তায় ইসলামী ব্যাংক তুলে দেওয়া হয় এস আলমের হাতে। একই বছরের অক্টোবরে এসআইবিএল-এর নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয় এস আলমের হাতে। এভাবে একই গ্রুপের হাতে ৭টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয়। এর আগে ২০১৬ সালে ইউসিবি ব্যাংকের একক নিয়ন্ত্রণ নেয় সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরিবার। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল করতে ২০১৭ সালের ৩০ জুলাই তৎকালীন পরিদর্শন বিভাগের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামান পরিদর্শন কার্যক্রম সীমিত করতে অভিনব এক নির্দেশনা দেন। এস আলমসহ বিভিন্ন অভিযুক্তদের জালিয়াতি আড়াল করতে ওই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে তখনই অভিযোগ ওঠে। এর পুরস্কার হিসেবে মনিরুজ্জামান এস আলম গ্রুপ থেকে নানা সুবিধা পেয়েছেন। আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট বিএফআইইউ-এর এক তদন্তে উঠে এসেছে—কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অবসরের পর তিনি ২৭ মাস এস আলমের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ারে চাকরি করেন। বেতন ও ফি বাবদ পান প্রায় তিন কোটি টাকা।
পরিস্থিতি যা দাঁড়ায়
একের পর এক সুবিধা দেওয়ায় ঋণ আদায়ে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থে কখনো বিশেষ ব্যবস্থায় ঋণ পুনর্তফসিল বা পুনর্গঠন সুবিধা আদায় করলেও পণ্যমূল্য কমানোর ওপর নজর দেননি। বরং নানা শিথিলতার সুযোগে নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার করেছেন। এসবের ফল হিসেবে ২০২১ সাল থেকে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দীর্ঘদিনের জন্য পুরো অর্থনীতিকে গ্রাস করেছে। ৮৪ টাকার ডলারের দর ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় উঠেছে। ২০২১ সালের আগস্টে ৪৮ বিলিয়নের ওপরে ওঠা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে আওয়ামী লীগ পতনের সময়ে ২৫ বিলিয়নের নিচে নেমে যায়। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ধস নামে। দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসে তলানিতে। পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এক ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে।
বিপর্যয় কাটাতে ২০২২ সালে আইএমএফ (IMF)-এর দ্বারস্থ হয় তৎকালীন সরকার। বিভিন্ন শর্ত মেনে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে সরকার। ২০২৩ সালের শুরুতে ঋণের প্রথম কিস্তি পায় বাংলাদেশ। পরবর্তীতে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। শর্ত পালনে ব্যর্থতার কারণে শেষ তিনটি কিস্তি আর মেলেনি। সরকার চলমান ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে এসে নতুন করে ৫০০ কোটি ডলার ঋণ কর্মসূচির চেষ্টা করছে। এ রকম সময়ে এখন আবার নানা শিথিলতা আনা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির কারণে মুখে কিছুটা কঠোরতা দেখালেও বাস্তবে নানা শিথিলতা আনা হয়। বিশেষ করে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে এমন কিছু বিষয় যুক্ত করা হয় যা বিশেষ ব্যবস্থার শামিল। এক পরিবার থেকে পরিচালক সংখ্যা কমিয়ে চারজনের স্থলে তিনজনে নামানো হয়। তবে আইনের অন্য একটি উপধারা যুক্ত করে বলা হয়—তাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পরিবারের অতিরিক্ত সদস্যদের পরিচালক করা যাবে। আইনে নতুন ধারা যুক্ত করে বলা হয়, গ্রুপভুক্ত এক প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলেও আরেক প্রতিষ্ঠান ঋণ নিতে পারবে, ব্যাংকিং সুবিধা পাবে। তবে এস আলমসহ আওয়ামী পন্থী ব্যবসায়ীদের অনিয়মের কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদেই অনেকগুলো ব্যাংক গ্রাহক আস্থা হারায়। তখন থেকে গ্রাহকরা টাকা তুলতে পারছেন না।
আগস্ট পরবর্তী
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কঠোরতার কারণে সেই পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি হয়। আইএমএফ-এর ঋণ কর্মসূচির অন্যতম শর্ত ছিল ব্যাংক খাতের শিথিলতা তুলে দিতে হবে। আর কৌশলে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এরপর যেন লাফিয়ে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। ২০২৩ সাল শেষে খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, মোট ঋণের যা ৯ শতাংশ।
এরপর দ্রুত বেড়ে ২০২৪ সালের জুনে ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশে উঠে যায়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর যেন বিদ্যুৎ গতিতে বেড়েছে। ২০২৪ সাল শেষে উঠে যায় ৩ লাখ ৪৫ riches ৭৬৫ কোটি টাকা যা ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। এরপর আরও বেড়ে গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বা ৩৫ দশমিক দশমিক ৭৩ শতাংশ হয়।
লাফিয়ে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণে কিছুটা লাগাম টানতে বিশেষ পুনর্তফসিল সুবিধা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে করে শেষ তিন মাসে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমে গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায় নেমেছে। মোট ঋণের যা প্রায় ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে ৩১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা বেড়ে খেলাপি ঋণ উঠেছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। মোট ঋণের যা ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। বর্তমানের এই খেলাপি হার এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এত বেশি খেলাপি আছে কিনা সেই তথ্য পাওয়া যায়নি।
সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া খেলাপি ঋণ কমানোর কোনো উপায় নেই। আর এ দেশে গণমাধ্যম সত্যকারের ভূমিকা রাখতে পারে। স্বাধীনভবে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য তুলে ধরার মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। আমানতকারীরা কোন ব্যাংকে টাকা রাখা নিরাপদ, তা গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে বুঝতে পারেন। এর ভিত্তিতে সাধারণ মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং কর্মকর্তাদের অনৈতিক বা স্বজনপ্রীতিমূলক কার্যকলাপের সমালোচনা করে গণমাধ্যম এক ধরনের সামাজিক চাপ তৈরি করে। একই সাথে ভিত্তিহীন গুজব থেকে বিরত থাকার জন্যও স্বাধীন গণমাধ্যম অপরিহার্য।
এক নজরে দেখে নেই ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি
* ২০০৯: ২২,৪৮১ কোটি টাকা
* ডিসেম্বর, ২৪: ৩,৪৫,৭৬৫ কোটি টাকা
* মার্চ, ২৫: ৪,২০,৩৩৫ কোটি টাকা
* জুন, ২৫: ৫,৩০,৪২৮ কোটি টাকা
* সেপ্টেম্বর, ২৫: ৬,৪৪,৫১৫ কোটি টাকা
* ডিসেম্বর, ২৫: ৫,৫৭,২১৬ কোটি টাকা
* মার্চ, ২৬: ৫,৮৮, ৭০৪ কোটি টাকা।
চ্যালেঞ্জসমূহ
* সুষ্ঠুভাবে পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ উদ্যোগ সম্পন্ন করা।
* আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন উদ্যোগ সম্পন্ন করা।
* খেলাপি ঋণ আদায় ও পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনা।
* ৬০ হাজার কোটি টাকা তহবিলের সুষ্ঠু ব্যবহার করে অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
* বাংলাদেশ ব্যাংকে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে আর্থিক খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার করা।
নজর রাখতে হবে
* ইসলামী ব্যাংক
* নগদ
* দুর্বল ব্যাংক
* ঋণ কেলেঙ্কারি ও অর্থ পাচারকারী
* ব্যাংক কোম্পানিসহ বিভিন্ন আইন সংশোধন
সুপারিশ
১. ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের জন্য তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। আর এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব নিয়ন্ত্রক সংস্থায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা দরকার।
২. ঋণখেলাপিদের কেবল সুবিধা না দিয়ে ভালো গ্রাহকদের জন্য সুবিধা রাখতে হবে।
৩. কোনোভাবেই ব্যাংকগুলোর সূচক কৃত্রিমভাবে ভালো না দেখিয়ে প্রকৃত চিত্র দেখানোর ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।
৪. ব্যাংক খাতে পরিবারতন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত করতে আইন আরও কঠোর করতে হবে।
৫. ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদকে দায়বদ্ধ করতে হবে।
৬. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
৭. সব পর্যায়ে শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভালো কাজের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
লেখকদ্বয় সাংবাদিক: ওবায়দুল্লাহ রনি, সমকাল; সানাউল্লাহ সাকিব, প্রথম আলো।
এএ
ওবায়দুল্লাহ রনি, সানাউল্লাহ সাকিব